জুলাই বিপ্লবে যে রিকশাওয়ালা, হকার, ভ্যানে আইসক্রিমওয়ালা, সবাই ছাত্রদের সঙ্গে একেবারে অ্যাকশন মুভির মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল—ওই একই টিম আবার মুক্তিযুদ্ধেও নামল। আর তখনকার মায়েরাও ঠিক সুপার মা—বীরদের হাতে ভাত তুলে দিচ্ছে, আরেক মা আবার ছেলে পাঠাচ্ছে যুদ্ধে, যেন “দেশপ্রেমের রান্নাঘর” চালু হয়েছে।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো—যুদ্ধে যারা কষ্ট করল তারা সাধারণ মানুষ, আর পরে ফায়দা লুটল শার্ট-প্যান্টওয়ালা, জেল হেয়ারস্টাইল দেওয়া আধা-ইন্টেলেকচুয়ালরা। এরা রাজনীতি করল না, কিন্তু পরে বলল—“আরে, আমরা তো লিডার ম্যাটেরিয়াল!”। বাপ ভিক্ষা করেছে, ছেলেরা বাপকে হজ্জ্ব করিয়ে বলে দিল—“আমরা সম্ভ্রান্ত মুসলিম ফ্যামিলি, বুঝছো?”।
কোট-টাই পরে, টিভি টকশোতে বসে, চোখে কাজল দিয়ে এমন ভান করে যে মনে হয় লন্ডনের রানীর খালাতো ভাই। অথচ এরা গতকালও পাতলা খান লেনের টিনের ঘরে ছিল। আজ ধানমণ্ডির ফ্ল্যাটে বসে অন্যকে “ক্ষ্যাত” বলে।
আশির দশকে আবার নতুন ফ্যাশন হলো—কালচারাল উইং। ছেলে-মেয়েরা ভাবত, একবার আবৃত্তি শিখলেই অভিজাত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেদু মিয়ার ছেলে রবীন্দ্রনাথের লুক মেরে টেবিল ঠুকতে ঠুকতে কবিতা পড়ে, আর পাশের জনকে নিচু চোখে দেখে বলে, “তুমি খুব গ্রামীণ”। ওদিকে লাহোরে ভাট্টি সেরেস্তাদারের ছেলে গজল শুনে ভাবে সে যেন মুঘল সম্রাটের নাতি।
কিন্তু বাইরে দুনিয়াটা ঠিক উল্টা। ইউরোপে মেট্রোতে বসে থাকে কমলা জামা পরা ঝাড়ুদার আর কোটি টাকার কোম্পানির সিইও, দুইজনেই কফি নিয়ে গল্প করে। আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় উল্টা—এখানে নতুন করে আবার শ্রেণীপ্রথা বানাই, যেন আভিজাত্য একটা “স্টার্টআপ বিজনেস”।
বাংলাদেশে সামাজিক উন্নতি হয় না, এখানে হয় “দালান দখল আপগ্রেড”। ১৯৪৮ সালে যে কুঁড়ে ঘরে ছিল, ১৯৭২ এ সে ধানমণ্ডির দালান দখল করে বসে। তারপর বাচ্চু-কাচ্চু-দুলু একে একে সবাই গাড়ি-বাড়ি-ভুঁড়ি-নারী করে নিল। আর ধর্ম মামারা মাইকে দাঁড়িয়ে দাড়িপাল্লায় সোনা মেপে ফেলল।
মজার ব্যাপার হলো, এখানে রাজনীতি ধর্মের মতো, আবার ধর্ম রাজনীতির মতো। মসজিদের মুয়াজ্জিনের নাতনি “কালচারাল উইং” হয়ে টকশোতে দাড়িওয়ালাদের নিয়ে হাসাহাসি করে। সংশয়বাদীর নাতি আবার “ধর্ম উইং” হয়ে ফেসবুকে অন্যকে নাস্তিক বানিয়ে ফেলে।
ঢাকায় আরামে থাকা পরিবারের ছেলে পরে মুক্তিযুদ্ধের “চেতনা সৈনিক” হয়ে বলে, আসল শহীদের ছেলে হলো “রাজাকার”! এদিকে তরুণরা একে অপরকে হিন্দু হলে ভারতীয়, মুসলিম হলে পাকিস্তানি বলে ডাকে।
সবচেয়ে বড় মজা হলো—আমাদের সমাজে সবার আসল টার্গেট হলো “ইনফেরিয়র হয়ে সুপিরিয়র সাজা”। সবাই এমন ভান করে, মনে হয় সে-ই একমাত্র বিশুদ্ধ মানুষ—বাকিরা সব নোংরা।
শেষ কথা?
বাংলাদেশ আসলে একটা এন্ডলেস রিয়েলিটি শো—“কে আগে লুঠ করবে, কে আগে টকশোতে বিশুদ্ধ সাজবে?”। ডান-বাম, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত—সবাই মিলে একটাই কাজ করছে: দেশটাকে ধীরে ধীরে “লাশকাটা ঘর” বানাচ্ছে।